গরু পাচার নিয়ে অমিত শাহকে কেন নিশানা তৃণমূল কংগ্রেসের?

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • Published

ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে গরু পাচারের মামলায় কেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহকে জেরা করা হবে না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী।

গরু পাচার সম্পর্কিত মামলায় তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলার এক প্রভাবশালী নেতা অনুব্রত মণ্ডল, তার কন্যা এবং দেহরক্ষী সহ গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকেই।

কেন্দ্রীয় এজেন্সি বছর দুয়েক ধরে তদন্ত চালাচ্ছে গরু পাচার নেটওয়ার্ক নিয়ে। কিন্তু অভিষেক ব্যানার্জীর প্রশ্ন, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব অমিত শাহের অধীনে থাকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের, তাই মি. শাহকেও কেন জেরা করা হবে না?

এই প্রসঙ্গে বিজেপি তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ নিয়ে বলছে যে বিএসএফের মধ্যে যারা গরু পাচারে যুক্ত ছিলেন, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গরু পাচারের বিশাল নেটওয়ার্কে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের সংশ্লিষ্টতা থেকে নজর ঘোরাতেই অমিত শাহের নাম আনা হচ্ছে বলেও তারা মন্তব্য করছে।

কী অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেসের?

বীরভূমে এক জনসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী মঙ্গলবার বলেন, “গরু চোর ধরতে বেরিয়েছে সব।"

এই কথাটি সম্ভবত তিনি কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিগুলির উদ্দেশ্যে বলেন, যারা প্রায় দুবছর ধরে গরু পাচার নেটওয়ার্ক নিয়ে তদন্ত করছে। ওই মামলাতেই বীরভূমের প্রতাপশালী তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই মামলার তদন্তে বহু ভুয়া ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের এবং কীভাবে গরু পাচারকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন তিনি, তারও খোঁজ পাওয়া গেছে, এমনটাই অভিযোগ কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির।

মি. ব্যানার্জী তার ভাষণে আরও বলেন, “তৃণমূলের বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলকে গ্রেফতার করে দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছে। তদন্ত তদন্তের মতো চলবে। আমি কাউকে ডিফেন্ড করছি না। কিন্তু ইডি চার্জশিটে বলেছে, বিএসএফ গরু পাচারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত দিয়েছে। বিএসএফ কার অধীনে? অমিত শাহের অধীনে। তাহলে তাঁকে কেন গ্রেফতার করা হবে না?”

পাচারকারীদের সঙ্গে অফিসারদের যোগাযোগ, তা জানত বাহিনী

বিবিসি ২০২০ সালেই রিপোর্ট করেছিল যে বিএসএফের মহাপরিচালককে ২০১৬ সালে চিঠি দিয়ে পাচারকারীদের সঙ্গে বাহিনীর এক শ্রেণীর অফিসারের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে সতর্ক করেন এক জুনিয়র বিএসএফ অফিসার। কোন অফিসাররা পাচারকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন অভিযোগ করা হয়েছিল সেই চিঠিতে।

ওই চিঠিতে লেখা হয়েছিল, “ফারাক্কায় অবস্থিত ২০ নম্বর ব্যাটালিয়নের অফিসারদের কলকাতায় দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তের সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ পাঠানো হচ্ছে যাতে পাচারকারীদের কথা শুনে চলা হয়। চোরাচালান করতে দিতে নির্দেশ আসছে। আবার বাহিনী সরিয়ে নিয়ে পাচারের কাজে সুবিধা করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।"

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বা বিএসএফ সদর দপ্তর ওই অফিসারদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয় নি দীর্ঘদিন। কয়েকজনকে শুধু দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বিষয়টি প্রথম সামনে আসে ২০১৮ সালে কেরালায় বিএসএফের একজন কমান্ডান্ট জিবু ম্যাথ্যু বিপুল পরিমাণ নগদ সহ ধরা পড়ার পরে। ততদিনে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির তদন্ত শুরু হয়ে গেছে।

২০২০ সালে আরেক কমান্ডান্ট সতীশ কুমারও গ্রেপ্তার হন, কিন্তু শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়ে যান তিনি।

পাচারের সঙ্গে জড়িত বিএসএফ, নেতা, পুলিশ, শুল্ক দপ্তরও

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএসএফ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, “যাদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হয়েছিল, তাদের মধ্যে একজনকে প্রায় বিনা বাধায় চাকরী, এমনকি দেশ ছেড়ে চলেও যেতে দেওয়া হয়েছে। আরেকজন শীর্ষ অফিসার ফিরে গেছেন নিজের রাজ্যে এবং উচ্চপদে চাকরীও করছেন।“

মি. ম্যাথ্যু গ্রেপ্তার হওয়ার প্রায় চার বছর পরে কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে আবারও ধরা পড়েন কমান্ডান্ট সতীশ কুমার।

বিএসএফ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, গরু পাচারের সর্বশেষ যে চক্রটি চলছিল, তা শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে। ঘটনাচক্রে ধৃত কমান্ডান্ট সতীশ কুমার ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ২০১৭ মার্চ পর্যন্ত মালদা এবং মুর্শিদাবাদে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ৬টি ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন।

দীর্ঘদিন দিল্লির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের খবরাখবর যোগাড় করতেন প্রাক্তন সাংবাদিক চন্দন নন্দী বলছেন, শুধু যে বিএসএফের অফিসারেরা ওই পাচারকারীদের সঙ্গে যোগসাজস রাখতেন, তা নয়, স্থানীয় পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা এবং শুল্ক দপ্তরের একাংশও জড়িত থাকত চক্রের সঙ্গে।

এতদিন পরে, কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিগুলি সেই নেটওয়ার্ক খুঁজে বার করছে।

মি. নন্দীর কথায়, “যে র‍্যাঙ্কের অফিসারেরা পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠছে তারা খুবই উচ্চপদে আসীন ছিলেন। তাই বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যতটা গুরুত্ব দিয়ে এই বিষয়টিতে নজর দেওয়া উচিত ছিল, তার কিছুই করা হয় নি। “বিএসএফের দায়িত্ব ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়দায়িত্বের একটা রাজনৈতিক দিকও আছে। ক্ষমতাসীন দল যতটা চাইবে, তদন্ত ততটাই এগোবে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলটির কি কি রাজনৈতিক লাভ হতে পারে, সেই বিষয়টা তারা মাথায় রেখেই তদন্ত এগোচ্ছে,” বলছিলেন চন্দন নন্দী।

তার কথায়, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে তো একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল যে গরু পাচারের সঙ্গে যারাই জড়িত, সে যত বড় নেতাই হোন না কেন, নিজের দলের বা অন্য কোনও দলের, অথবা তিনি যত বড় অফিসারই হোন না কেন, কাউকে ছাড়া হবে না।“

‘কাউকে ছাড়া হবে না, এটাই আমাদের নীতি’: বিজেপি

বিজেপি বলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই তো গরু পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত এতজন ধরা পড়ছে।

বিজেপির মুখপাত্র কেয়া ঘোষের কথায়, “পদক্ষেপ না নিলে কী বিএসএফের পদস্থ কর্মকর্তারা কি গ্রেপ্তার হতেন? কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনও দুর্নীতি বন্ধ করতে বদ্ধ পরিকর।

“শুধু এই ঘটনায় নয়, যত বড় প্রভাবশালীই হোন না কেন, যত বড় অফিসারই হোন না কেন, কাউকে ছাড়া হবে না, এটাই আমাদের সরকারের নীতি,” বলছিলেন কেয়া ঘোষ।

তার কথায়, একের পর এক দুর্নীতির ঘটনায় ধরা পড়ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা। সেদিক থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই অমিত শাহ এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করছেন অভিষেক ব্যানার্জী।