আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মোদীর সমালোচক তিস্তা সেতালভাদকে মাঝরাতে যেভাবে স্বস্তি দিল সুপ্রিম কোর্ট
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
২০০২ সালে গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংক্রান্ত একটি মামলায় ভারতের সুপরিচিত অ্যাক্টিভিস্ট ও সমাজকর্মী তিস্তা সেতালভাদকে গুজরাট হাইকোর্ট ‘অবিলম্বে আত্মসমর্পণে’র নির্দেশ দিলেও মাঝরাতে এজলাস বসিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আপাতত তাঁকে রেহাই দিয়েছে।
হাইকোর্টের নির্দেশে তারা অবাক হয়ে গেছেন বলে জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা আরও বলেছেন, “মিস সেতালভাদ আরও কিছুদিন জামিনে থাকলে কি মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ত?”
এর আগে গত ৩০ জুন (শুক্রবার) গুজরাটের হাইকোর্টের বিচারপতি নির্ঝর দেশাই তিস্তা সেতালভাদের জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়ে তাঁকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণ করতে বলেছিলেন।
মিস সেতালভাদের আইনজীবী মিহির ঠাকোরে এই নির্দেশের বাস্তবায়ন ৩০ দিনের জন্য স্থগিত রাখারও আর্জি জানিয়েছিলেন, যাতে তারা এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু হাইকোর্ট সেই আবেদনও খারিজ করে দেয়।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট তিস্তা সেতালভাদের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছিল, তার সুবাদেই এতদিন তিনি গ্রেপ্তার থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছিলেন।
তিস্তা সেতালভাদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সবচেয়ে কঠোর সমালোচকদের একজন, গুজরাটের দাঙ্গাপীড়িতরা যাতে সুবিচার ও আইনি প্রতিকার পান তার জন্য তিনি বহু বছর ধরে লড়াই চালিয়ে আসছেন।
গত বছর সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর গুজরাটের অ্যান্টি-টেরর স্কোয়াড মিস সেতালভাদকে তাঁর মুম্বাইয়ের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে এনেছিল – যার পর তাঁকে প্রায় ৭০ দিন জেলে কাটাতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ
গুজরাট হাইকোর্ট তিস্তা সেতালভাদের জামিন খারিজ করে দিয়ে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে বলার পর ভারতের শীর্ষ আদালত স্বত:প্রণোদিতভাবেই বিষয়টি ‘কগনিজেন্সে’ নেয়, অর্থাৎ শুনানির জন্য গ্রহণ করে। মিস সেতালভাদের আইনজীবীও অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট আপিল করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টে এখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে – ফলে বিষয়টি যায় বিচারপতি অভয় ওকা ও বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রর অবসরকালীন ডিভিশন বেঞ্চে।
ভারতের আইন-আদালত বিষয়ক পোর্টাল ‘লাইভ ল’ জানাচ্ছে, বিচারপতি ওকা মিস সেতালভাদকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিতে চাইলেও বিচারপতি মিশ্র তাতে সায় দেননি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন :
শনিবার (১লা জুলাই) দুপুরে তাঁরা বিষয়টি নিয়ে একমত হতে পারেননি বলে মামলাটি বৃহত্তর বেঞ্চে পেশ করার নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়।
সেই অনুযায়ী সেদিন বেশি রাতেই মামলাটি শোনেন বিচারপতি বি আর গাভাই, এ এস বোপান্না ও দীপঙ্কর দত্তকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ।
মধ্যরাতের সেই শুনানিতে গুজরাট সরকারের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, “তিস্তা সেতালবাদ একজন কমন ক্রিমিনাল (সাধারণ অপরাধী)। একজন সাধারণ মানুষের জামিন নামঞ্জুর হলে যা করা হয়ে থাকে, এক্ষেত্রেও সেটাই করা হবে বলে বিচারপতিদের কাছে আশা করব।”
ডিভিশন বেঞ্চ কিন্তু স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যে ব্যক্তি গত দশ মাস ধরে জামিনে আছেন তিনি আরও বাড়তি কয়েকটা দিন জামিনে থাকলে হাইকোর্টের কী সমস্যা সেটাই তাদের মাথায় ঢুকছে না!
বিচারপতি গাভাই বলেন, “ওঁনাকে হেফাজতে নেওয়ার কী এত তাড়া ছিল? কয়েক দিনের জন্য অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিলে মাথায় কি আকাশ ভেঙে পড়ত?”
“হাইকোর্ট যা করেছে তাতে তো আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি। এতো ‘অ্যালার্মিং আর্জেন্সি’ কীসের? ... এমন কী কমন ক্রিমিনালদেরও কিন্তু অন্তর্বর্তী জামিন মঞ্জুর করা হয়”, আরও যোগ করেন তিনি।
এরপরই সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গুজরাট হাইকোর্টের একক বেঞ্চের নির্দেশের ওপর এক সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেয় – যার ফলে তিস্তা সেতালভাদকে এখনই আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে না।
মোদী সরকার বনাম তিস্তা সেতালভাদ
নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে তিস্তা নিজেকে একজন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গায় স্বজনহারানো ভিক্টিমরা যাতে ন্যায় বিচার পান, তার জন্য গত দুই দশক ধরে একটানা লড়াই চালিয়ে আসছেন তিস্তা জাভেদ শেতালভাদ ও তার এনজিও সিটিজেনস ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস (সিজেপি)।
দাঙ্গাপীড়িতরা যাতে যথাযথ আইনি সহায়তা পান ও তাদের আর্থিকভাবে সাহায্য করা যায়, সে উদ্দেশ্য নিয়েই গুজরাট দাঙ্গার ঠিক পর পরই ওই এনজিওটি গড়ে তোলা হয়েছিল।
কিন্তু সিজেপি কোথা থেকে অর্থ পাচ্ছে, বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এনজিওটি অবৈধভাবে তহবিল সংগ্রহ করছে কি না - তা নিয়ে বিজেপি আমলে মিস সেতালভাদকে বারে বারেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।
গুজরাট দাঙ্গায় রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অব্যাহতিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন মিস সেতালভাদ ও জাকিয়া জাফরি - যার স্বামী ও কংগ্রেস নেতা এহসান জাফরিকে দাঙ্গাকারীরা জীবন্ত জ্বালিয়ে হত্যা করেছিল।
জাকিয়া জাফরি মূল আবেদনকারী হলেও তিস্তা সেতালভাদ ছিলেন সেই মামলার কো-পিটিশনার।
গত বছরের জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ সেই মামলা খারিজ করে দিয়ে মন্তব্য করেছিল, তিস্তা সেতালভাদ মিস জাফরির আবেগকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
বিচারপতি এ এম খানউইলকরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আরও বলে, "মিস সেতালভাদ চাইছেন দাঙ্গা নিয়ে বিতর্কের আগুন যেন জিইয়ে রাখা যায়, বা অন্যভাবে বললে তাওয়া গরম রাখা যায়।"
এরপরই বার্তা সংস্থা এএনআই-কে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়ে মিস সেতালভাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অমিত শাহ ওই সাক্ষাৎকারে বলেন, "বহু ভিক্টিমের হয়ে এনজিও-ই হলফনামায় সই করে দিত, তারা জানতও না কিছু। সবাই জানে তিস্তা সেতালভাদের এনজিও এসব করে আসছিল।"
"আর তখন যে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা তিস্তা সেতালভাদের এনজিওকে প্রচুর সাহায্য করেছিল, এটাও ল্যুটিয়েনস দিল্লিতে সবারই জানা।"
মিস সেতালভাদের মতো কেউ কেউ লাগাতার প্রধানমন্ত্রী মোদীকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এমনও ইঙ্গিত করেন তিনি। দলীয়ভাবে বিজেপিও তিস্তা সেতালভাদের পুরনো সব কাজকর্ম নিয়ে তদন্তের দাবি জানায়।
এর পরই গুজরাট পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ তিস্তা সেতালভাদের বিরুদ্ধে নথিপত্রে জালিয়াতি করা-সহ বিভিন্ন অভিযোগে এফআইআর নথিভুক্ত করে।
২০২২ সালের ২৫শে জুন সকালে গুজরাটের অ্যান্টি-টেররজিম স্কোয়াড (এটিএস) তিস্তা সেতালভাদের মুম্বাইয়ের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে তুলে আনে, যার পর প্রায় আড়াই মাস তাঁকে জেলে কাটাতে হয়েছিল।